জনপদ গ্রামীণ জনপদ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ব্যাবসা-বানিজ্য-অর্থনীতি আমাদের প্রসঙ্গে

,

,

প্রচ্ছদ
Gaibandha.news image: 'স্মৃতি একাত্তর : রণাঙ্গনের পথে'-'

স্মৃতি একাত্তর : রণাঙ্গনের পথে

গাইবান্ধা ডট নিউজ | বুধবার ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯

এস.এম.ওয়াহেদুন্নবী মিন্টু:

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে গাইবান্ধা ডট নিউজ এর বিশেষ আয়োজন ডিসেম্বর মাসজুড়ে প্রতিদিন একটি করে ৭১র মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গাইবান্ধার নানা ঘটনার স্মৃতিচারন - হৃদয়ে একাত্তর

১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে সারাদেশে অফিস আদালত কলকারখানার কর্মকর্তা কর্মজীবী শ্রমিকসহ জনগণ অফিস আদালত কলকারখানা বন্ধ করে আন্দোলনকে বেগবান করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেওয়া সামরিক বাহিনী রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ জনগণের উপর নির্বিকারে গুলি বর্ষণ করে। সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে কালক্ষেপন করে গোপনে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। সোয়াত জাহাজে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গোলা বারুদ অস্ত্র সম্ভার চিটাগাং নৌবন্দরে আনে। সারাদেশে উত্তপ্ত আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে অগ্নিগর্ভে রূপান্তরিত হয়েছে একটি মাত্র শ্লোগান ’তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। এমনি এক সময়ে আমার শশুরালয় যশোহর জেলার নড়াইল মহকুমার কালিয়া থানার মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত বাগুডাঙ্গা গ্রাম থেকে খবর পেলাম আমার প্রথম কন্যা সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে। গাইবান্ধা থেকে কন্যা সন্তানকে দেখার জন্য রওনা হয়েছি। যাত্রাপথ গাইবান্ধা থেকে লোকাল ট্রেনে সান্তাহার, সান্তাহার থেকে মেইল ট্রেনে খুলনা, খুলনা থেকে দৌলতপুর হয়ে লঞ্চ যোগে প্রায় ৮ ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে ২ কিলোমিটার পায়ে হেটে যেতে হয় আমার শশুরের আবাসস্থলে। গাইবান্ধা রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে খবর নিলাম ট্রেন সান্তাহার পর্যন্ত যাবে না। সামনে ট্রেনলাইন তুলে ফেলা হয়েছে, বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছে।

ভূমিষ্ট হওয়া প্রথম কন্যা সন্তানকে দেখার ব্যাকুলতায় সমস্ত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে যাত্রাপথ পরিবর্তন করে নরসিংদির উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেখানে আমার কাকা শশুর মুখ্য পাট পরিদর্শক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে ২২ মার্চ নরসিংদিতে কাকা শশুরের ভাড়া বাড়িতে উপস্থিত হই। সেই সময় নরসিংদিতে আলীজান জুট মিল, জাভা টেক্সটাইল মিলসহ অন্যান্য কলকারখানার শ্রমিকরা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে ঢাকা থেকে নরসিংদি আসার পথগুলো সার্বক্ষণিকভাবে সতর্ক পাহারায় নিয়োজিত ছিল। এদিকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী আলোচনা দীর্ঘায়িত করে। ২৫ মার্চ মধ্য রাত্রিতে ঢাকা মহানগরীর ঘুমন্ত মানুষের উপর পাকহানাদার বাহিনী ট্যাংক কামান বিভিন্ন সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তারা শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় নাই, সেই সঙ্গে অতর্কিত আক্রমন করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানার ইপিআর ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সেনানিবাসে বাঙালি সেনা সদস্যদের উপর আক্রমণ করে। এই খবর সারাদেশে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন সেনাক্যাম্প, ইপিআর ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসা বাঙালি সদস্যরা একত্রিত হয়ে অনেক স্থানে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। সেই সময় ঢাকা সেনানিবাস, জয়দেবপুর ও আখাউড়া থেকে আসা বেশ কিছু সংখ্যক সেনা সদস্য এবং ইপিআর সদস্যরা নরসিংদি ব্রাহ্মনদি কলেজের আম বাগানে অবস্থান নেয়। ইতোমধ্যে পাকহানাদার বাহিনী ঘোড়াশালে অবস্থান নেয়। এই সংবাদ পাওয়ার পর সম্মিলিত বাঙালি সেনা সদস্যরা ঘোড়াশাল অভিমুখে প্রতিরোধ করার জন্য অগ্রসর হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধের পর পুনরায় তারা আমবাগানে ১ দিন অবস্থান করার পর আখাউড়ার দিকে অগ্রসর হয়। সম্ভবত মার্চ মাসের ২৮/২৯ তারিখে পাকহানাদার বাহিনীর দুটি জঙ্গী বিমান সকাল ১০/১১টার দিকে ব্রাহ্মণদি কলেজের আমবাগান সহ নরসিংদি বাজারে বিমান আক্রমণ চালায়। বিমান আক্রমনে নরসিংদি বাজারের চাউলের আড়তসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়। বিমান হামলায় প্রায় দেড়শত নিরীহ মানুষ নিহত এবং আহত হয়।

আমরা খবর পেলাম পাকহানাদার বাহিনী নরসিংদির উপকণ্ঠে চলে এসেছে। আতংকিত মানুষের ছোটাছুটি কে কোথায় পাকহানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষার জন্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিবে। আমরাও বাড়িওয়ালা খাদ্য পরিদর্শক সাহেবের সঙ্গে তার গ্রামের বাড়ি শিবপুর থানার দিকে অগ্রসর হলাম। আমাদের মত অনেকেই পায়ে হেটে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের গ্রামের বাড়িতে ২ দিন থাকার পর খবর পেলাম নরসিংদির অবস্থা আপাতত শান্ত হয়েছে। আমি আমার কাকা শশুর, কাকী শাশুড়ী, ছোট দুই শ্যালিকাসহ শিবপুর থেকে পুনরায় নরসিংদির দিকে চলে আসি। ঐদিনই বাড়ি থেকে শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে গোপালগঞ্জ ঘাট দিয়ে শশুরালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হই। অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ২ দিনে শশুরালয়ে উপস্থিত হই।

প্রতিশোধের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখায় ভুলে গেলাম আমার প্রিয় স্ত্রী আর সদ্যপ্রসূত কন্যা সন্তানের কথা। তখন শুধু একটাই লক্ষ্য প্রতিশোধ আর স্বাধীনতা। সমস্ত ¯েœহ মমতার বাধা বন্ধনকে উপক্ষো করে একটাই মাত্র উদ্দেশ্য একটাই মাত্র লক্ষ্য হায়েনার হিং¯্র থাবা থেকে দেশমাতৃকা মুক্ত করতে হবে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। যাত্রাপথ গোপালগঞ্জের গোবিনাথপুর (ডড়ার বাজার) লঞ্চঘাট হয়ে টেকের হাটের ভিতর দিয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ঢাকার সদরঘাট হয়ে বাসে তারাকে ঘাট পাড়ি দিয়ে বাবুর বাজার হয়ে নরসিংদি থেকে লোকাল ট্রেনে টংগী জংশন। আবার সেখান থেকে ট্রেন বদল করে ময়মনসিংহ জামালপুর হয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট। পথিমধ্যে নরসিংদি রেলওয়ে ষ্টেশনে কর্মরত টিকিট কালেক্টর গাইবান্ধার বর্তমান পুরাতন হাসপাতাল লেনের খোরশেদ সাহেবকে পেলাম। তার সঙ্গে নিজ আবাসস্থল গাইবান্ধায় যাওয়ার বিষয়ে পরামর্শ করলাম। তিনি আমাকে কমলাপুর ষ্টেশন দিয়ে আমার গন্তব্যে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে নিরুৎসাহিত করেন। সেই সময় কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে হানাদার বাহিনীর সামরিক পুলিশ সদস্যরা উঠতি বয়সের যুবকদের ধরে নিয়ে যেত। সেই হতভাগ্য যুবকরা আর কখনো তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেত না। আমি খোরশেদ ভাই এর পরামর্শে নরসিংদি রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে গন্তব্যের পথে যাত্রা করলাম। ট্রেনে হানাদার বাহিনীর একটি ভ্রাম্যমান দল অবস্থান করছিল তা পরে জানতে পারলাম। ঘোড়াশাল ষ্টেশনে আমাদের বহনকারী ট্রেনটি আসলো। ট্রেন কেবল যাত্রা শুরু করেছ সেই সময় পাকহানাদার বাহিনীর ১ জন ক্যাপ্টেনসহ ৪/৫জন সিপাই আমার বগিতে উঠে আসে এবং কামরায় উপবিষ্ট সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে ক্যাপ্টেন উর্দুতে বলে উঠে ইধার আও। আমরা কামরার কয়েকজন যাত্রী আতংকিত হয়ে উঠি। যাত্রীদের মধ্যে কাকে উঠে আসতে বলছে তা আমাদের কারো বোধগম্য হচ্ছিল না। পুনরায় ক্যাপ্টেন চিৎকার করে বলে উঠলো আরে বেঈমান কা বাচ্চা.... (লেখার অনুপযুক্ত), ইপিআর কি আদমি বলেই আমার দিকে এগিয়ে এসে শার্টের কলার ধরে হ্যাচকা টান মেরে হাটু দিয়ে বুকে আঘাত করে। আঘাতে আমি ট্রেনের মেঝেতে পড়ে যাই। পড়ে যাওয়া অবস্থাতেই তাদের হাতে রক্ষিত জি-থ্রী রাইফেলের বাটের গুতো আর বুটের লাথিতে মনে হচ্ছিল আমার পিঠের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেলো। ট্রেন টংগী জংশন ষ্টেশনে এসে থামলো। এখান থেকে ট্রেন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে।

তারা আমাকে ট্রেনের বগি থেকে শার্টের কলার ধরে তাদের জন্য রক্ষিত ভ্রাম্যমান কামরায় নিয়ে এল। সেখানে আরও দুইজন যুবকের দেখা পেলাম। ক্যাপ্টেন এক পর্যায়ে আমাকে উর্দুতে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। আমি ইপিআর সদস্য। ইতোমধ্যে পাকহানাদার বাহিনীর অনেক অফিসার প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি সেনা ও ইপিআর সদস্যদের প্রচন্ড আক্রমনে নিহত হয়েছে। আমি এক পর্যায়ে তাকে বুঝাতে সক্ষম হলাম আমি ইপিআর সদস্য নই। আমি একজন নিরীহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে রক্ষা পেয়ে যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নতুন জীবন পেলাম। ট্রেন এক সময় ঢাকার পথে যাত্রা শুরু করলো। ট্রেনের কামরায় রক্ষিত আমার দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্রের ব্যাগ একজন যাত্রী জানালা দিয়ে আমার হাতে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সারা শরীরে প্রচন্ড রক্তের চাপ অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিলো সারা শরীরের চামড়া কেটে কেটে রক্ত পড়বে। প্রচন্ড ব্যথায় শরীর কুকড়ে উঠছে। আমার গন্তব্য পথের ট্রেন ঢাকা থেকে আসতে এখনো দেরি আছে। আমি টঙ্গি ষ্টেশনের পার্শ্বে এক ঔষধের দোকানে একজন ডাক্তার পেলাম। তিনি গভীর মনযোগের সঙ্গে আমার নির্যাতনের কথা শুনে সমবেদনা প্রকাশ করলেন। ডাক্তার ব্যথা কমানোর জন্য ৬টি কটোপারিন ট্যাবলেট ভাত খাবার পর একসাথে খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। টঙ্গির একটি হোটেলে ভাত খেয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ৬টি ট্যাবলেট খেয়ে নিলাম। আমার গন্তব্যে যাওয়ার ট্রেন এক সময় ঢাকা থেকে টংগী ষ্টেশনে আসে। টংঙ্গী থেকে বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। ট্রেনের কামরায় উঠে নিজের পরিধেয় বস্ত্রের দিকে নজর দিলাম। আমার পরণে ছিল লুঙ্গি, ফুলহাতা শার্ট যা পাকহানাদার বাহিনীর নির্যাতনে ছিন্নভিন্ন। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে মনে হচ্ছিলো সামনের পথ আরও বিপদসংকুল হতে পারে। এমনকি যে কোন সময়ে মৃত্যুর মুখোমুখিও হতে পারি। ব্যাগ থেকে আমার পরিধেয় একটি ট্যাট্টনের ফুলপ্যান্ট এবং ফুলহাতা সবুজ গেঞ্জী বের করে পরে নিলাম। ভাবছিলাম মৃত্যু যদি আসেই তবে যেন এই ছিন্নভিন্ন পরিচ্ছেদে না আসে। তাই পোশাক পরিবর্তন করে মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। ট্রেন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছে আর আমিও মনে মনে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার পরিকল্পনার জাল বুনতে বুনতে অবসন্ন ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছি। যখন ঘুম ভাঙলো তখন ট্রেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ষ্টেশন পেরিয়ে ময়মনসিংহ জংশনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেই সময় দেখতে পেলাম ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ষ্টেশনের নাম পরিবর্তন করে উর্দুতে এবং ইংরেজিতে ময়মনসিংহ ক্যান্ট ষ্টেশন লেখা হয়েছে। ময়মনসিংহ ষ্টেশনে এসে মনে হল এটা যেন জনমানবহীন প্রেতপুরিতে পরিণত হয়েছে। যে দিকে তাকাই শুধু পাকহানাদার বাহিনীর পদচারণায় ভূতড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ট্রেন আবার গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হল কিন্তু ট্রেনের কামরায় আমিই একমাত্র যাত্রী।

দেওয়ানগঞ্জ বাজার ষ্টেশনে এসে ট্রেন যাত্রা বিরতি করলো। এখান থেকে ট্রেন আর সামনে বাহাদুরাবাদ ঘাটের দিকে যাবে না। ষ্টেশন মাষ্টারের কাছে জানতে পারলাম আগামীকাল সকালের দিকে একটা ট্রেন বাহাদুরাবাদ ঘাটে যাবে। পরের দিন যাত্রা করতে হবে শুনে আশেপাশে কোন থাকা খাওয়ার হোটেল আছে কিনা তা জানার জন্য ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা। ষ্টেশনের পাশের একজন দোকানির কাছে জানতে পারলাম দেওয়ানগঞ্জ বাজারে থাকা এবং খাওয়ার হোটেল আছে। আমি দেওয়ানগঞ্জ বাজারে যাওয়ার রাস্তা ছেড়ে ষ্টেশনের কলোনীর ভিতর দিয়ে রওনা হলাম। তখনো জানতাম না এই রেলওয়ে কলোনিতে বসবাসকারী সকলে বিহারী। কলোনীর মাঠে রেডিও হাতে বেশ কয়েকজন বসে আছে। দেখে মনে করলাম ওরা বোধ হয় স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর শুনছে। কাছে গিয়ে ওদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম ভাই আমি নরসিংদি থেকে এসেছি। গাইবান্ধায় যাব। আগামীকালের সকালের ট্রেন বাহাদুরাবাদ ঘাটের ফেরি ধরিয়ে দিবে কি? আপাতত: রাত্রে খাবার এবং থাকার জন্য আশেপাশে হোটেলের কোন ব্যবস্থা আছে কিনা?

ওদের কথায় বুঝতে পারলাম আমি ওদের বাঙালি ভেবে ভুল করেছি। ওদের মধ্যে একজনকে দলপতি মনে হল। সে আমাকে একের পর এক প্রশ্নবানে জর্জরিত করলো। আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব, কেন যাব, আমি কোন দল করি। আমিও প্রশ্নের উত্তরে বললাম আমার বাড়ি গাইবান্ধায়। আমি নরসিংদিতে একটা কাপড়ের দোকানে চাকুরি করতাম। দোকানের মালিক জামায়াতে ইসলামের সমর্থক হওয়ায় তার দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এই মুহুর্তে কোন কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিজ বাড়িতে যাচ্ছি। আমার উত্তর শুনে দলপতি গর্জে উঠে বললো যাকে ধরি সেই বলে পাকিস্তানি। তো এত বিহারী জবাই করল কে। যাত্রা পথে নির্যাতন ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন দেহ মন এক সঙ্গে বিদ্রোহ করে কেন যেন মনে হল এভাবে বাঁচার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি ওদেরকে বললাম তোমরা যদি মনে কর আমিই বিহারী জবাই করেছি তবে এই মূহুর্তে আমাকে জবাই করে তার প্রতিশোধ নিতে পার। আমার স্পষ্ট উত্তরে ওদের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হল। ওদের মধ্যে থেকে একজন উর্দুতে বললো এ আদমি সাচ্চা পাকিস্তানি আদমি হ্যায়। আমরা এর আগে যে সমস্ত বাঙালিকে ধরেছি তারা ভয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য অনুনয় বিনয় হাতজোড় করে কান্নাকাটি করে জীবন ভিক্ষা চেয়েছে। নিশ্চয়ই এ লোক আমাদের পক্ষের। এক সময় ওরা বললো আপনি চলে যেতে পারেন। আমি পায়ে হেঁটে অল্প কিছু দূরে দেওয়ানগঞ্জ নতুন বাজারে উপস্থিত হলাম। যাত্রাপথে এক সময় নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এই মূহুর্তে মৃত্যুভীতি আমাকে দিশেহারা করে ফেললো। ভাবছিলাম নতুন বাজারও বোধ হয় বিহারীদের ব্যবসা বাণিজ্যের স্থান। আমি কান পেতে ভাল করে শুনছি এরা বিহারী না বাঙালি। এক সময় নিশ্চিত হলাম এরা সবাই বাঙালি। বাজারের একজন ব্যবসায়ীকে আমার যাত্রা পথের নির্যাতনের ঘটনাসহ দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে কলোনীর বিহারীদের কথা বললাম। এই সময় বাজারের অনেক ব্যবসায়ী উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্য থেকে একজন বললো আপনার মা নিশ্চয়ই আপনার জীবন রক্ষার জন্য কচুর পাতায় করে ভিক্ষা দিয়েছে। তাই কলোনীর বিহারীদের মাঝ থেকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা বললেন আপনার এখানে বেশি সময় অতিবাহিত করা ঠিক হবে না। আপনাদের গাইবান্ধার মোমিনান পাড়ার একজন জামাই মাষ্টার সাহেব আছেন। এই মূহুর্তে হৃদয়বান মানুষটির নাম মনে করতে পারছি না। মাষ্টার সাহেব আমার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক চলে এলেন এবং একজন লোক দিয়ে দেওয়ানগঞ্জ পুরাতন বাজারের এক সুপারির আড়তে পাঠিয়ে দিলেন। রাত ১০টার দিকে মাষ্টার সাহেব সুপারির আড়তে আসলেন। তার সঙ্গে আলোচনা করলাম। যুদ্ধে যাবার আগে গাইবান্ধায় এসে নিজ বাড়িতে অবস্থানরত বাবা মায়ের দোয়া নেওয়ার কথা বললাম। তিনি পরের দিন ভোরে কামারজানী হাটে যাওয়ার একটি সুপারির নৌকায় গাইবান্ধার রসুলপুর ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ১৭ মে বিকাল ৫টায় রসুলপুর এসে পৌঁছলাম। রসুলপুর বাজার থেকে হাটা পথে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছি। পথিমধ্যে রসুলপুর বাজারের ব্যবসায়ী রেশন ডিলার মজিবর-বাবু ভাই, বাবু ভাই বলে ডাকছিল। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। সে আমার কাছে এসে বললো মুক্তিযুদ্ধের খবর কি? আমি ওকে বললাম আমি বাবু ভাই নই, আমি তার ছোট ভাই মিন্টু। ওর কাছ থেকে শুনতে পেলাম আমার পরিচিত অনেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ করার জন্য গিয়েছে। আমার বাবা মায়ের তিন সন্তান। জ্যেষ্ঠ এস.এম, নূরুন্নবী বাবু, আমি মেজ এস.এম. ওয়াহিদুন্নবী মিন্টু, কনিষ্ঠ এস.এম. রেজাউন্নবী রেজা। জানতে পারলাম আমার জ্যেষ্ঠ এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য ভারতে গিয়েছে। আমি অনুভব করলাম দিনের আলোয় বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ঠিক হবে না। সন্ধ্যার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যাওয়ার পথে পুরাতন টিএন্ডটি একচেঞ্জের সামনে বাজার ফেরত কঞ্চিপাড়ার কয়েকজন পরিচিত লোক আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ভাই আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমি তাদেরকে বললাম বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাব। তারা উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন পাড়ায় পাড়ায় শান্তি কমিটি গঠন হয়েছে, তারা রাস্তা পাহারা দিচ্ছে। আর পাকহানাদার বাহিনী রাস্তায় টহল দিচ্ছে। আপনার যে কোন মুহুর্তে বিপদ ঘটতে পারে। বাবা মাকে দেখার ব্যাকুলতা আমাকে সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করার সাহস যোগাল। অন্ধকার মনুষ্যবিহীন রাস্তাঘাট, মহল্লার বাড়িগুলি নিঃশব্দ ভীতিকর পরিবেশে মনে হচ্ছিল যেন প্রেতপুরিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এরই মধ্যে শান্তি কমিটির পাহারা আর পাকহানাদার বাহিনীর টহল থেকে নিজেকে আড়াল করে বাড়িতে এসে উপস্থিত হলাম। অন্ধকার বাড়ির গেট পেরিয়ে ঘরের দরজায় এসে মাকে নিচু স্বরে ডাকলাম। ঘরের ভিতর থেকে শব্দ পেলাম ভাবী বলছিলো মা-কে জেনো মা মা করে ডাকছে। সেই মূহুর্তে মা দরজা খুলে আমাকে জড়িয়ে ধরে উচ্চস্বরে কান্না শুরু করায় আমি মায়ের মুখ চেপে ধরে বললাম ছেলে চাও না, কাঁদতে চাও। তখন রাত প্রায় দশটা, রাস্তায় টহলরত হানাদার বাহিনীর গাড়ীর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। মা, বাবা, ভাবী, আমার বেঁচে থাকার বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। কারণ দীর্ঘ সময় আমার অনুপস্থিতি। আমার বাবা আমাকে রাত্রি যাপন করে অতি প্রত্যুষে গন্তব্যে যাওয়ার কথা বললেন। আমি বললাম- আমার দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য ভারতে গিয়েছে, তা শান্তি কমিটিসহ সবাই জানে। তাই আমার রাত্রিযাপন করা বিপদজনক। এমনকি রাতে পাকহানাদার বাহিনী আমার জন্য বাড়ী ঘেরাও করতে পারে। ¯েœহময়ী মা আমাকে দরদ ভরা কান্না বিজড়িত কণ্ঠে একটু খেয়ে যাওয়ার জন্য বললেন।

আমি বললাম আমার সময় নেই, যে কোন মূহুর্তে হানাদার বাহিনী বাড়ি ঘেরাও করতে পারে। মা একগ্লাস দুধ খেতে দিলেন। বাবা যাত্রাপথের জন্য কয়েকশত টাকা দিলেন। সবার দোয়া নিয়ে রণাঙ্গনের পথে রওনা হলাম। রসুলপুর বাজারে মজিবরের দোকানে রাত্রি যাপন করে প্রত্যুষে ব্রহ্মপুত্র নদী নৌকায় পাড়ি দিয়ে মোল্লারচর হাটে উপস্থিত হলাম। সেখানে আমাদের এলাকার পরিচিত অনেকের মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পশ্চিম পাড়ার বাকালী হাউজের মকবুলার রহমান বাদলকে দেখতে পেলাম। ওর সঙ্গে কর্তীমারীর সুবেদার আফতাবের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে একরাত থেকে নৌপথে জিঞ্জিরাম নদী পেরিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের মানকারচর হয়ে মেঘালয়ের কাকড়িপাড়া যুব ক্যাম্পে উপস্থিত হলাম। সেখানে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ক্যাম্প ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন। আমি তার কাছে জানতে পারলাম আমার কণিষ্ঠ ভ্রাতা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য তুরা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অবস্থান করছে। কাকড়িপাড়া যুব ক্যাম্পের এ্যাডজুটেন্ট মাহাবুব ভাই, হাবিলদার মেজর আজিম, এনামুল ইসলাম টুকু, জামান, রতুসহ অনেকের সঙ্গে দেখা হল। পাকহানাদার বাহিনীর শারীরিক নির্যাতনে অসুস্থ থাকায় কাকড়িপাড়ার হাসপাতালের ডাক্তারের চিকিৎসায় ১০/১৫ দিন থাকার পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে সুবেদার আফতাব সাহেবের নেতৃত্বে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কর্তিমারি ক্যাম্পে চলে আসি। কয়েকদিনের মধ্যে সেখানকার সবার সঙ্গে পরিচতি হলাম। ক্যাম্প থেকে মাঝে মধ্যে ছোট ছোট অপারেশনে যেতে হতো।

কয়েকটি অপারেশনের মধ্যে উলিপুর রেলওয়ে ষ্টেশনে অপারেশন উল্লেখযোগ্য। উলিপুর ষ্টেশনে পাহারারত রাজাকারদের উপর অতর্কিত আক্রমন চালিয়ে নিরস্ত্র করে রেলওয়ে ষ্টেশন মাষ্টারসহ তাদের বন্দী করি। অপারেশন করে উলিপুর বাজার দিয়ে ক্যাম্পে ফেরার পথে পাকহানাদার বাহিনীর দোসর কাসেম মিঞার বাড়ি থেকে আমাদের লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড থ্রী নাট থ্রী রাইফেলের গুলি ছোড়ে। আমরা চাইনিজ সাব-মেশিনগান দিয়ে ঐ বাড়ি লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে ব্রহ্মপুত্র নদী পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পে চলে আসি। পরে জানতে পারি কাসেম মিয়ার চাচাতো ভাই শাহাবউদ্দিনের মাথার খুলি উড়ে গেছে। ইতোমধ্যে আর্মি, নেভী, ইপিআর, পুলিশ, মোজাহিদ, আনসার, স্বল্পকালীন উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের নিয়ে আমাদের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০০ হলো। আমাদের ৫০০ যোদ্ধার দল ২ এম.এফ কোম্পানী নামে পরিচিতি লাভ করে। আমাদের যোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়ায় ১ প্লাটুন যোদ্ধা কর্তিমারী হাইস্কুলে রেখে কোম্পানী হেডকোয়ার্টার রাজিবপুরে স্থানান্তর করা হয়। সুবেদার আফতাব সাহেবের নেতৃত্বে পেনাভরী নদীর পূর্বতীরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিরক্ষা বাঁধের তারাবো, শংকর মাধবপুর, চরনেওয়াজী, চরসাজাই, ধলাগাছা, ছালিপাড়া, তুসদ্বারা দফাদারের চর পর্যন্ত আমরা শক্ত প্রতিরোধ গড়েছিলাম। আমাদের যোদ্ধাদের অধিকাংশই সেনাছাউনি থেকে অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো। আমাদের অস্ত্র ভান্ডারে সিক্স ইঞ্চ মর্টার, থ্রী ইঞ্চ মর্টার, হেভী মেশিনগান, রকেট ম্যানচেষ্টার, বৃটিশ, চাইনিজ এসএলআর, এলএমজি, চাইনিজ সাব মেশিনগান, নাইন এমএম, এমএমসি চাইনিজ রাইফেল, এসএলআর এর মত অস্ত্র ছিল। রৌমারী থেকে মোল্লারচর পর্যন্ত সম্পূর্ণ এলাকা ছিলো আমাদের ২ এম.এফ কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা এই অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন রেখেছি। তুরা থেকে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের হেডকোর্য়াটার ছিল মেঘালয়ের কামাক্ষা মন্দিরে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানীগুলোর একমাত্র পথ ছিল আমাদের ডিফেন্সের উপর দিয়ে। এই পথ দিয়ে গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় পাকহানাদার বাহিনীর উপর চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাতো। পাকহানাদার বাহিনী অনুভব করতে পারলো একমাত্র চোরাগোপ্তা আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গেলে গেরিলা কোম্পানীগুলির ভিতরে আসার পথগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। আর তাদের একটাই মাত্র পথ আমাদের ডিফেন্স গুড়িয়ে দিতে হবে। ১৪ আগষ্ট ১৯৭১ সালে আনুমানিক বিকাল ৫:৩০ মিনিটে পাকহানাদার বাহিনী দুটি গান বোট নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে চরনেওয়াজী স্কুলের দিকে এগিয়ে আসে। তারাবোর ডিফেন্স থেকে চরনেওয়াজী স্কুল আমাদের হেভীমিডিয়াম মেশিনগান আর রকেট ম্যানচেষ্টার এর রেঞ্জের মধ্যে। ধীর গতিতে গানবোট দুটি নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে চরনেওয়াজী স্কুলের দিকে এগিয়ে আসে। ফায়ারিং রেঞ্জের মধ্যে আসা মাত্রই রকেট ল্যানচার ও মেশিনগান থেকে সেল এবং গুলি বর্ষণ করা হয়। রকেট ল্যানচার সেল নিক্ষেপে গানবোট দুটির, ১টির সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গানবোট দুটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। এদিকে চরনেওয়াজী স্কুলের অবস্থানরত হানাদার বাহিনী গোধুলী লগ্নে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবাহিত নালা দিয়ে আমাদের অবস্থানের উপর আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হতে থাকে এবং আমরাও তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে প্রস্তুতি নিতে থাকি। এক সময় আমাদের ফায়ারিং রেঞ্জের মধ্যে ওরা এসে পড়ায় আমরা গুলিবর্ষণ শুরু করি। গুলিবর্ষণে হানাদার বাহিনীর ১৪ সৈনিক নিহত হয় এবং বাকিরা দ্রুত পালিয়ে যায়। ইতোমধ্যে পাকহানাদার বাহিনী তাদের শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে এবং তারা তুষমারা এবং কোদালকাটির চরে তাদের অবস্থান দৃঢ় করে। সোনাভরী নদীর তীরবর্তী আমাদের ডিফেন্সের উপর অপর পার থেকে তারা প্রায়ই গুলিবর্ষণ করতো। এই সময় আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা আমাদের পাশে অবস্থান নেয়। নদীর এপার এবং ওপারের দুই পক্ষের প্রতিনিয়ত গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর শাফায়েত জামিলসহ ২ এম.এফ কোম্পানী এবং তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডিফেন্স পরিদর্শন এসে পরিদর্শন করার পর আমাদের যোদ্ধাদের উৎসাহিত করেন এবং সোনাভরী নদী পেরিয়ে কোদালকাটিতে শক্তঘাটি করার জন্য নির্দেশ দেন। আগষ্টের মাঝামাঝি তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট অবস্থান পরিবর্তন করে। সেই স্থলে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানীকে অবস্থান নিতে বলেন। নির্দেশ অনুসারে কোদালকাটি চরের দক্ষিণ অংশে আমাদের ২ এম.এফ কোম্পানীর অবস্থান এবং কোদালকাটির চরের উত্তর অংশে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানীর অবস্থান। উল্লেখ্য যে, আমি প্লাটুন কমান্ডার হিসাবে আমার প্লাটুনকে চরের সর্বশেষ দক্ষিণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেই। আগষ্টের শেষ সপ্তাহের শুক্রবার ফজরের নামাজের আজানের পরই হানাদার বাহিনী আর্টিলারী সেলিং শুরু করলে আমাদের কোম্পানীসহ প্রথম বেঙ্গলের যোদ্ধারা সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করি। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই হানাদার বাহিনী আক্রমণের জন্য সারিবদ্ধভাবে আমার প্লাটুনের দিকে এগিয়ে আসে। হানাদার বাহিনীর হয়তো ধারণা ছিল অল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থানে আছে। তাদেরকে জীবিত ধরা সম্ভব হবে। আমার প্লাটুনের অবস্থানের শেষ সীমা থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে চোরাবালি থাকায় হানাদার বাহিনীর ১টি কোম্পানী ঐ পথ ধরে অগ্রসর হয়ে চোরাবালিতে আটকে পড়ে। আমার অবস্থানের বাম পাশে এলএমজি পোস্ট থেকে আমার এলএমজি ম্যান আটকে পড়া পাকহানাদার বাহিনীকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। ঠিক সেই মুহুর্তে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানীর হেভিমেশিনগানগুলো আমাকে কভার দেওয়ার জন্য গুলি বর্ষণ শুরু করলে পাকহানাদার বাহিনীর আর্টিলারী সেলিং আর হেভি মেশিনগানের গুলি বর্ষণ এক সময় স্তব্ধ হয়ে যায়। কোদালকাটি যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর ২টি কোম্পানী নিহত ও আহতসহ পিছু হটতে বাধ্য হয়। অপরদিকে আমার প্লাটুনের ২জন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছামাদ ও আলতাফ হোসেন শাহাদৎ বরণ করেন।

- এস.এম. ওয়াহেদুন্নবী মিন্টু, একাত্তরে প্লাটুন কমান্ডার, ২-এম.এফ কোম্পানী।

 

কেআরআর/জিএআই



Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ছবি সংবাদ

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ফটো গ্যালারী

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ফটো ফিচার

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ভিডিও গ্যালারী

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ভিডিও প্রতিবেদন

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

সর্বশেষ খবর

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news image: 'হলি আর্টিজান হামলার রায় আজ, আদালত চত্বরে বিশেষ নিরাপত্তা'-'

হলি আর্টিজান হামলার রায় আজ, আদালত চত্বরে বিশেষ নিরাপত্তা

গাইবান্ধা ডট নিউজ | বুধবার ২৭ নভেম্বর ২০১৯

এস.এম.ওয়াহেদুন্নবী মিন্টু:

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে গাইবান্ধা ডট নিউজ এর বিশেষ আয়োজন ডিসেম্বর মাসজুড়ে প্রতিদিন একটি করে ৭১র মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গাইবান্ধার নানা ঘটনার স্মৃতিচারন - হৃদয়ে একাত্তর

১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে সারাদেশে অফিস আদালত কলকারখানার কর্মকর্তা কর্মজীবী শ্রমিকসহ জনগণ অফিস আদালত কলকারখানা বন্ধ করে আন্দোলনকে বেগবান করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেওয়া সামরিক বাহিনী রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ জনগণের উপর নির্বিকারে গুলি বর্ষণ করে। সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে কালক্ষেপন করে গোপনে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। সোয়াত জাহাজে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গোলা বারুদ অস্ত্র সম্ভার চিটাগাং নৌবন্দরে আনে। সারাদেশে উত্তপ্ত আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে অগ্নিগর্ভে রূপান্তরিত হয়েছে একটি মাত্র শ্লোগান ’তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। এমনি এক সময়ে আমার শশুরালয় যশোহর জেলার নড়াইল মহকুমার কালিয়া থানার মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত বাগুডাঙ্গা গ্রাম থেকে খবর পেলাম আমার প্রথম কন্যা সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে। গাইবান্ধা থেকে কন্যা সন্তানকে দেখার জন্য রওনা হয়েছি। যাত্রাপথ গাইবান্ধা থেকে লোকাল ট্রেনে সান্তাহার, সান্তাহার থেকে মেইল ট্রেনে খুলনা, খুলনা থেকে দৌলতপুর হয়ে লঞ্চ যোগে প্রায় ৮ ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে ২ কিলোমিটার পায়ে হেটে যেতে হয় আমার শশুরের আবাসস্থলে। গাইবান্ধা রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে খবর নিলাম ট্রেন সান্তাহার পর্যন্ত যাবে না। সামনে ট্রেনলাইন তুলে ফেলা হয়েছে, বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছে।

ভূমিষ্ট হওয়া প্রথম কন্যা সন্তানকে দেখার ব্যাকুলতায় সমস্ত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে যাত্রাপথ পরিবর্তন করে নরসিংদির উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেখানে আমার কাকা শশুর মুখ্য পাট পরিদর্শক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে ২২ মার্চ নরসিংদিতে কাকা শশুরের ভাড়া বাড়িতে উপস্থিত হই। সেই সময় নরসিংদিতে আলীজান জুট মিল, জাভা টেক্সটাইল মিলসহ অন্যান্য কলকারখানার শ্রমিকরা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে ঢাকা থেকে নরসিংদি আসার পথগুলো সার্বক্ষণিকভাবে সতর্ক পাহারায় নিয়োজিত ছিল। এদিকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী আলোচনা দীর্ঘায়িত করে। ২৫ মার্চ মধ্য রাত্রিতে ঢাকা মহানগরীর ঘুমন্ত মানুষের উপর পাকহানাদার বাহিনী ট্যাংক কামান বিভিন্ন সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তারা শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় নাই, সেই সঙ্গে অতর্কিত আক্রমন করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানার ইপিআর ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সেনানিবাসে বাঙালি সেনা সদস্যদের উপর আক্রমণ করে। এই খবর সারাদেশে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন সেনাক্যাম্প, ইপিআর ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসা বাঙালি সদস্যরা একত্রিত হয়ে অনেক স্থানে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। সেই সময় ঢাকা সেনানিবাস, জয়দেবপুর ও আখাউড়া থেকে আসা বেশ কিছু সংখ্যক সেনা সদস্য এবং ইপিআর সদস্যরা নরসিংদি ব্রাহ্মনদি কলেজের আম বাগানে অবস্থান নেয়। ইতোমধ্যে পাকহানাদার বাহিনী ঘোড়াশালে অবস্থান নেয়। এই সংবাদ পাওয়ার পর সম্মিলিত বাঙালি সেনা সদস্যরা ঘোড়াশাল অভিমুখে প্রতিরোধ করার জন্য অগ্রসর হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধের পর পুনরায় তারা আমবাগানে ১ দিন অবস্থান করার পর আখাউড়ার দিকে অগ্রসর হয়। সম্ভবত মার্চ মাসের ২৮/২৯ তারিখে পাকহানাদার বাহিনীর দুটি জঙ্গী বিমান সকাল ১০/১১টার দিকে ব্রাহ্মণদি কলেজের আমবাগান সহ নরসিংদি বাজারে বিমান আক্রমণ চালায়। বিমান আক্রমনে নরসিংদি বাজারের চাউলের আড়তসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়। বিমান হামলায় প্রায় দেড়শত নিরীহ মানুষ নিহত এবং আহত হয়।

আমরা খবর পেলাম পাকহানাদার বাহিনী নরসিংদির উপকণ্ঠে চলে এসেছে। আতংকিত মানুষের ছোটাছুটি কে কোথায় পাকহানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষার জন্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিবে। আমরাও বাড়িওয়ালা খাদ্য পরিদর্শক সাহেবের সঙ্গে তার গ্রামের বাড়ি শিবপুর থানার দিকে অগ্রসর হলাম। আমাদের মত অনেকেই পায়ে হেটে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের গ্রামের বাড়িতে ২ দিন থাকার পর খবর পেলাম নরসিংদির অবস্থা আপাতত শান্ত হয়েছে। আমি আমার কাকা শশুর, কাকী শাশুড়ী, ছোট দুই শ্যালিকাসহ শিবপুর থেকে পুনরায় নরসিংদির দিকে চলে আসি। ঐদিনই বাড়ি থেকে শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে গোপালগঞ্জ ঘাট দিয়ে শশুরালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হই। অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ২ দিনে শশুরালয়ে উপস্থিত হই।

প্রতিশোধের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখায় ভুলে গেলাম আমার প্রিয় স্ত্রী আর সদ্যপ্রসূত কন্যা সন্তানের কথা। তখন শুধু একটাই লক্ষ্য প্রতিশোধ আর স্বাধীনতা। সমস্ত ¯েœহ মমতার বাধা বন্ধনকে উপক্ষো করে একটাই মাত্র উদ্দেশ্য একটাই মাত্র লক্ষ্য হায়েনার হিং¯্র থাবা থেকে দেশমাতৃকা মুক্ত করতে হবে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। যাত্রাপথ গোপালগঞ্জের গোবিনাথপুর (ডড়ার বাজার) লঞ্চঘাট হয়ে টেকের হাটের ভিতর দিয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ঢাকার সদরঘাট হয়ে বাসে তারাকে ঘাট পাড়ি দিয়ে বাবুর বাজার হয়ে নরসিংদি থেকে লোকাল ট্রেনে টংগী জংশন। আবার সেখান থেকে ট্রেন বদল করে ময়মনসিংহ জামালপুর হয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট। পথিমধ্যে নরসিংদি রেলওয়ে ষ্টেশনে কর্মরত টিকিট কালেক্টর গাইবান্ধার বর্তমান পুরাতন হাসপাতাল লেনের খোরশেদ সাহেবকে পেলাম। তার সঙ্গে নিজ আবাসস্থল গাইবান্ধায় যাওয়ার বিষয়ে পরামর্শ করলাম। তিনি আমাকে কমলাপুর ষ্টেশন দিয়ে আমার গন্তব্যে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে নিরুৎসাহিত করেন। সেই সময় কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে হানাদার বাহিনীর সামরিক পুলিশ সদস্যরা উঠতি বয়সের যুবকদের ধরে নিয়ে যেত। সেই হতভাগ্য যুবকরা আর কখনো তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেত না। আমি খোরশেদ ভাই এর পরামর্শে নরসিংদি রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে গন্তব্যের পথে যাত্রা করলাম। ট্রেনে হানাদার বাহিনীর একটি ভ্রাম্যমান দল অবস্থান করছিল তা পরে জানতে পারলাম। ঘোড়াশাল ষ্টেশনে আমাদের বহনকারী ট্রেনটি আসলো। ট্রেন কেবল যাত্রা শুরু করেছ সেই সময় পাকহানাদার বাহিনীর ১ জন ক্যাপ্টেনসহ ৪/৫জন সিপাই আমার বগিতে উঠে আসে এবং কামরায় উপবিষ্ট সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে ক্যাপ্টেন উর্দুতে বলে উঠে ইধার আও। আমরা কামরার কয়েকজন যাত্রী আতংকিত হয়ে উঠি। যাত্রীদের মধ্যে কাকে উঠে আসতে বলছে তা আমাদের কারো বোধগম্য হচ্ছিল না। পুনরায় ক্যাপ্টেন চিৎকার করে বলে উঠলো আরে বেঈমান কা বাচ্চা.... (লেখার অনুপযুক্ত), ইপিআর কি আদমি বলেই আমার দিকে এগিয়ে এসে শার্টের কলার ধরে হ্যাচকা টান মেরে হাটু দিয়ে বুকে আঘাত করে। আঘাতে আমি ট্রেনের মেঝেতে পড়ে যাই। পড়ে যাওয়া অবস্থাতেই তাদের হাতে রক্ষিত জি-থ্রী রাইফেলের বাটের গুতো আর বুটের লাথিতে মনে হচ্ছিল আমার পিঠের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেলো। ট্রেন টংগী জংশন ষ্টেশনে এসে থামলো। এখান থেকে ট্রেন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে।

তারা আমাকে ট্রেনের বগি থেকে শার্টের কলার ধরে তাদের জন্য রক্ষিত ভ্রাম্যমান কামরায় নিয়ে এল। সেখানে আরও দুইজন যুবকের দেখা পেলাম। ক্যাপ্টেন এক পর্যায়ে আমাকে উর্দুতে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। আমি ইপিআর সদস্য। ইতোমধ্যে পাকহানাদার বাহিনীর অনেক অফিসার প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি সেনা ও ইপিআর সদস্যদের প্রচন্ড আক্রমনে নিহত হয়েছে। আমি এক পর্যায়ে তাকে বুঝাতে সক্ষম হলাম আমি ইপিআর সদস্য নই। আমি একজন নিরীহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে রক্ষা পেয়ে যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নতুন জীবন পেলাম। ট্রেন এক সময় ঢাকার পথে যাত্রা শুরু করলো। ট্রেনের কামরায় রক্ষিত আমার দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্রের ব্যাগ একজন যাত্রী জানালা দিয়ে আমার হাতে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সারা শরীরে প্রচন্ড রক্তের চাপ অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিলো সারা শরীরের চামড়া কেটে কেটে রক্ত পড়বে। প্রচন্ড ব্যথায় শরীর কুকড়ে উঠছে। আমার গন্তব্য পথের ট্রেন ঢাকা থেকে আসতে এখনো দেরি আছে। আমি টঙ্গি ষ্টেশনের পার্শ্বে এক ঔষধের দোকানে একজন ডাক্তার পেলাম। তিনি গভীর মনযোগের সঙ্গে আমার নির্যাতনের কথা শুনে সমবেদনা প্রকাশ করলেন। ডাক্তার ব্যথা কমানোর জন্য ৬টি কটোপারিন ট্যাবলেট ভাত খাবার পর একসাথে খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। টঙ্গির একটি হোটেলে ভাত খেয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ৬টি ট্যাবলেট খেয়ে নিলাম। আমার গন্তব্যে যাওয়ার ট্রেন এক সময় ঢাকা থেকে টংগী ষ্টেশনে আসে। টংঙ্গী থেকে বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। ট্রেনের কামরায় উঠে নিজের পরিধেয় বস্ত্রের দিকে নজর দিলাম। আমার পরণে ছিল লুঙ্গি, ফুলহাতা শার্ট যা পাকহানাদার বাহিনীর নির্যাতনে ছিন্নভিন্ন। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে মনে হচ্ছিলো সামনের পথ আরও বিপদসংকুল হতে পারে। এমনকি যে কোন সময়ে মৃত্যুর মুখোমুখিও হতে পারি। ব্যাগ থেকে আমার পরিধেয় একটি ট্যাট্টনের ফুলপ্যান্ট এবং ফুলহাতা সবুজ গেঞ্জী বের করে পরে নিলাম। ভাবছিলাম মৃত্যু যদি আসেই তবে যেন এই ছিন্নভিন্ন পরিচ্ছেদে না আসে। তাই পোশাক পরিবর্তন করে মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। ট্রেন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছে আর আমিও মনে মনে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার পরিকল্পনার জাল বুনতে বুনতে অবসন্ন ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছি। যখন ঘুম ভাঙলো তখন ট্রেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ষ্টেশন পেরিয়ে ময়মনসিংহ জংশনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেই সময় দেখতে পেলাম ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ষ্টেশনের নাম পরিবর্তন করে উর্দুতে এবং ইংরেজিতে ময়মনসিংহ ক্যান্ট ষ্টেশন লেখা হয়েছে। ময়মনসিংহ ষ্টেশনে এসে মনে হল এটা যেন জনমানবহীন প্রেতপুরিতে পরিণত হয়েছে। যে দিকে তাকাই শুধু পাকহানাদার বাহিনীর পদচারণায় ভূতড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ট্রেন আবার গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হল কিন্তু ট্রেনের কামরায় আমিই একমাত্র যাত্রী।

দেওয়ানগঞ্জ বাজার ষ্টেশনে এসে ট্রেন যাত্রা বিরতি করলো। এখান থেকে ট্রেন আর সামনে বাহাদুরাবাদ ঘাটের দিকে যাবে না। ষ্টেশন মাষ্টারের কাছে জানতে পারলাম আগামীকাল সকালের দিকে একটা ট্রেন বাহাদুরাবাদ ঘাটে যাবে। পরের দিন যাত্রা করতে হবে শুনে আশেপাশে কোন থাকা খাওয়ার হোটেল আছে কিনা তা জানার জন্য ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা। ষ্টেশনের পাশের একজন দোকানির কাছে জানতে পারলাম দেওয়ানগঞ্জ বাজারে থাকা এবং খাওয়ার হোটেল আছে। আমি দেওয়ানগঞ্জ বাজারে যাওয়ার রাস্তা ছেড়ে ষ্টেশনের কলোনীর ভিতর দিয়ে রওনা হলাম। তখনো জানতাম না এই রেলওয়ে কলোনিতে বসবাসকারী সকলে বিহারী। কলোনীর মাঠে রেডিও হাতে বেশ কয়েকজন বসে আছে। দেখে মনে করলাম ওরা বোধ হয় স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর শুনছে। কাছে গিয়ে ওদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম ভাই আমি নরসিংদি থেকে এসেছি। গাইবান্ধায় যাব। আগামীকালের সকালের ট্রেন বাহাদুরাবাদ ঘাটের ফেরি ধরিয়ে দিবে কি? আপাতত: রাত্রে খাবার এবং থাকার জন্য আশেপাশে হোটেলের কোন ব্যবস্থা আছে কিনা?

ওদের কথায় বুঝতে পারলাম আমি ওদের বাঙালি ভেবে ভুল করেছি। ওদের মধ্যে একজনকে দলপতি মনে হল। সে আমাকে একের পর এক প্রশ্নবানে জর্জরিত করলো। আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব, কেন যাব, আমি কোন দল করি। আমিও প্রশ্নের উত্তরে বললাম আমার বাড়ি গাইবান্ধায়। আমি নরসিংদিতে একটা কাপড়ের দোকানে চাকুরি করতাম। দোকানের মালিক জামায়াতে ইসলামের সমর্থক হওয়ায় তার দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এই মুহুর্তে কোন কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিজ বাড়িতে যাচ্ছি। আমার উত্তর শুনে দলপতি গর্জে উঠে বললো যাকে ধরি সেই বলে পাকিস্তানি। তো এত বিহারী জবাই করল কে। যাত্রা পথে নির্যাতন ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন দেহ মন এক সঙ্গে বিদ্রোহ করে কেন যেন মনে হল এভাবে বাঁচার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি ওদেরকে বললাম তোমরা যদি মনে কর আমিই বিহারী জবাই করেছি তবে এই মূহুর্তে আমাকে জবাই করে তার প্রতিশোধ নিতে পার। আমার স্পষ্ট উত্তরে ওদের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হল। ওদের মধ্যে থেকে একজন উর্দুতে বললো এ আদমি সাচ্চা পাকিস্তানি আদমি হ্যায়। আমরা এর আগে যে সমস্ত বাঙালিকে ধরেছি তারা ভয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য অনুনয় বিনয় হাতজোড় করে কান্নাকাটি করে জীবন ভিক্ষা চেয়েছে। নিশ্চয়ই এ লোক আমাদের পক্ষের। এক সময় ওরা বললো আপনি চলে যেতে পারেন। আমি পায়ে হেঁটে অল্প কিছু দূরে দেওয়ানগঞ্জ নতুন বাজারে উপস্থিত হলাম। যাত্রাপথে এক সময় নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এই মূহুর্তে মৃত্যুভীতি আমাকে দিশেহারা করে ফেললো। ভাবছিলাম নতুন বাজারও বোধ হয় বিহারীদের ব্যবসা বাণিজ্যের স্থান। আমি কান পেতে ভাল করে শুনছি এরা বিহারী না বাঙালি। এক সময় নিশ্চিত হলাম এরা সবাই বাঙালি। বাজারের একজন ব্যবসায়ীকে আমার যাত্রা পথের নির্যাতনের ঘটনাসহ দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে কলোনীর বিহারীদের কথা বললাম। এই সময় বাজারের অনেক ব্যবসায়ী উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্য থেকে একজন বললো আপনার মা নিশ্চয়ই আপনার জীবন রক্ষার জন্য কচুর পাতায় করে ভিক্ষা দিয়েছে। তাই কলোনীর বিহারীদের মাঝ থেকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা বললেন আপনার এখানে বেশি সময় অতিবাহিত করা ঠিক হবে না। আপনাদের গাইবান্ধার মোমিনান পাড়ার একজন জামাই মাষ্টার সাহেব আছেন। এই মূহুর্তে হৃদয়বান মানুষটির নাম মনে করতে পারছি না। মাষ্টার সাহেব আমার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক চলে এলেন এবং একজন লোক দিয়ে দেওয়ানগঞ্জ পুরাতন বাজারের এক সুপারির আড়তে পাঠিয়ে দিলেন। রাত ১০টার দিকে মাষ্টার সাহেব সুপারির আড়তে আসলেন। তার সঙ্গে আলোচনা করলাম। যুদ্ধে যাবার আগে গাইবান্ধায় এসে নিজ বাড়িতে অবস্থানরত বাবা মায়ের দোয়া নেওয়ার কথা বললাম। তিনি পরের দিন ভোরে কামারজানী হাটে যাওয়ার একটি সুপারির নৌকায় গাইবান্ধার রসুলপুর ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ১৭ মে বিকাল ৫টায় রসুলপুর এসে পৌঁছলাম। রসুলপুর বাজার থেকে হাটা পথে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছি। পথিমধ্যে রসুলপুর বাজারের ব্যবসায়ী রেশন ডিলার মজিবর-বাবু ভাই, বাবু ভাই বলে ডাকছিল। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। সে আমার কাছে এসে বললো মুক্তিযুদ্ধের খবর কি? আমি ওকে বললাম আমি বাবু ভাই নই, আমি তার ছোট ভাই মিন্টু। ওর কাছ থেকে শুনতে পেলাম আমার পরিচিত অনেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ করার জন্য গিয়েছে। আমার বাবা মায়ের তিন সন্তান। জ্যেষ্ঠ এস.এম, নূরুন্নবী বাবু, আমি মেজ এস.এম. ওয়াহিদুন্নবী মিন্টু, কনিষ্ঠ এস.এম. রেজাউন্নবী রেজা। জানতে পারলাম আমার জ্যেষ্ঠ এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য ভারতে গিয়েছে। আমি অনুভব করলাম দিনের আলোয় বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ঠিক হবে না। সন্ধ্যার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যাওয়ার পথে পুরাতন টিএন্ডটি একচেঞ্জের সামনে বাজার ফেরত কঞ্চিপাড়ার কয়েকজন পরিচিত লোক আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ভাই আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমি তাদেরকে বললাম বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাব। তারা উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন পাড়ায় পাড়ায় শান্তি কমিটি গঠন হয়েছে, তারা রাস্তা পাহারা দিচ্ছে। আর পাকহানাদার বাহিনী রাস্তায় টহল দিচ্ছে। আপনার যে কোন মুহুর্তে বিপদ ঘটতে পারে। বাবা মাকে দেখার ব্যাকুলতা আমাকে সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করার সাহস যোগাল। অন্ধকার মনুষ্যবিহীন রাস্তাঘাট, মহল্লার বাড়িগুলি নিঃশব্দ ভীতিকর পরিবেশে মনে হচ্ছিল যেন প্রেতপুরিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এরই মধ্যে শান্তি কমিটির পাহারা আর পাকহানাদার বাহিনীর টহল থেকে নিজেকে আড়াল করে বাড়িতে এসে উপস্থিত হলাম। অন্ধকার বাড়ির গেট পেরিয়ে ঘরের দরজায় এসে মাকে নিচু স্বরে ডাকলাম। ঘরের ভিতর থেকে শব্দ পেলাম ভাবী বলছিলো মা-কে জেনো মা মা করে ডাকছে। সেই মূহুর্তে মা দরজা খুলে আমাকে জড়িয়ে ধরে উচ্চস্বরে কান্না শুরু করায় আমি মায়ের মুখ চেপে ধরে বললাম ছেলে চাও না, কাঁদতে চাও। তখন রাত প্রায় দশটা, রাস্তায় টহলরত হানাদার বাহিনীর গাড়ীর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। মা, বাবা, ভাবী, আমার বেঁচে থাকার বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। কারণ দীর্ঘ সময় আমার অনুপস্থিতি। আমার বাবা আমাকে রাত্রি যাপন করে অতি প্রত্যুষে গন্তব্যে যাওয়ার কথা বললেন। আমি বললাম- আমার দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য ভারতে গিয়েছে, তা শান্তি কমিটিসহ সবাই জানে। তাই আমার রাত্রিযাপন করা বিপদজনক। এমনকি রাতে পাকহানাদার বাহিনী আমার জন্য বাড়ী ঘেরাও করতে পারে। ¯েœহময়ী মা আমাকে দরদ ভরা কান্না বিজড়িত কণ্ঠে একটু খেয়ে যাওয়ার জন্য বললেন।

আমি বললাম আমার সময় নেই, যে কোন মূহুর্তে হানাদার বাহিনী বাড়ি ঘেরাও করতে পারে। মা একগ্লাস দুধ খেতে দিলেন। বাবা যাত্রাপথের জন্য কয়েকশত টাকা দিলেন। সবার দোয়া নিয়ে রণাঙ্গনের পথে রওনা হলাম। রসুলপুর বাজারে মজিবরের দোকানে রাত্রি যাপন করে প্রত্যুষে ব্রহ্মপুত্র নদী নৌকায় পাড়ি দিয়ে মোল্লারচর হাটে উপস্থিত হলাম। সেখানে আমাদের এলাকার পরিচিত অনেকের মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পশ্চিম পাড়ার বাকালী হাউজের মকবুলার রহমান বাদলকে দেখতে পেলাম। ওর সঙ্গে কর্তীমারীর সুবেদার আফতাবের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে একরাত থেকে নৌপথে জিঞ্জিরাম নদী পেরিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের মানকারচর হয়ে মেঘালয়ের কাকড়িপাড়া যুব ক্যাম্পে উপস্থিত হলাম। সেখানে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ক্যাম্প ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন। আমি তার কাছে জানতে পারলাম আমার কণিষ্ঠ ভ্রাতা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য তুরা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অবস্থান করছে। কাকড়িপাড়া যুব ক্যাম্পের এ্যাডজুটেন্ট মাহাবুব ভাই, হাবিলদার মেজর আজিম, এনামুল ইসলাম টুকু, জামান, রতুসহ অনেকের সঙ্গে দেখা হল। পাকহানাদার বাহিনীর শারীরিক নির্যাতনে অসুস্থ থাকায় কাকড়িপাড়ার হাসপাতালের ডাক্তারের চিকিৎসায় ১০/১৫ দিন থাকার পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে সুবেদার আফতাব সাহেবের নেতৃত্বে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কর্তিমারি ক্যাম্পে চলে আসি। কয়েকদিনের মধ্যে সেখানকার সবার সঙ্গে পরিচতি হলাম। ক্যাম্প থেকে মাঝে মধ্যে ছোট ছোট অপারেশনে যেতে হতো।

কয়েকটি অপারেশনের মধ্যে উলিপুর রেলওয়ে ষ্টেশনে অপারেশন উল্লেখযোগ্য। উলিপুর ষ্টেশনে পাহারারত রাজাকারদের উপর অতর্কিত আক্রমন চালিয়ে নিরস্ত্র করে রেলওয়ে ষ্টেশন মাষ্টারসহ তাদের বন্দী করি। অপারেশন করে উলিপুর বাজার দিয়ে ক্যাম্পে ফেরার পথে পাকহানাদার বাহিনীর দোসর কাসেম মিঞার বাড়ি থেকে আমাদের লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড থ্রী নাট থ্রী রাইফেলের গুলি ছোড়ে। আমরা চাইনিজ সাব-মেশিনগান দিয়ে ঐ বাড়ি লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে ব্রহ্মপুত্র নদী পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পে চলে আসি। পরে জানতে পারি কাসেম মিয়ার চাচাতো ভাই শাহাবউদ্দিনের মাথার খুলি উড়ে গেছে। ইতোমধ্যে আর্মি, নেভী, ইপিআর, পুলিশ, মোজাহিদ, আনসার, স্বল্পকালীন উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের নিয়ে আমাদের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০০ হলো। আমাদের ৫০০ যোদ্ধার দল ২ এম.এফ কোম্পানী নামে পরিচিতি লাভ করে। আমাদের যোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়ায় ১ প্লাটুন যোদ্ধা কর্তিমারী হাইস্কুলে রেখে কোম্পানী হেডকোয়ার্টার রাজিবপুরে স্থানান্তর করা হয়। সুবেদার আফতাব সাহেবের নেতৃত্বে পেনাভরী নদীর পূর্বতীরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিরক্ষা বাঁধের তারাবো, শংকর মাধবপুর, চরনেওয়াজী, চরসাজাই, ধলাগাছা, ছালিপাড়া, তুসদ্বারা দফাদারের চর পর্যন্ত আমরা শক্ত প্রতিরোধ গড়েছিলাম। আমাদের যোদ্ধাদের অধিকাংশই সেনাছাউনি থেকে অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো। আমাদের অস্ত্র ভান্ডারে সিক্স ইঞ্চ মর্টার, থ্রী ইঞ্চ মর্টার, হেভী মেশিনগান, রকেট ম্যানচেষ্টার, বৃটিশ, চাইনিজ এসএলআর, এলএমজি, চাইনিজ সাব মেশিনগান, নাইন এমএম, এমএমসি চাইনিজ রাইফেল, এসএলআর এর মত অস্ত্র ছিল। রৌমারী থেকে মোল্লারচর পর্যন্ত সম্পূর্ণ এলাকা ছিলো আমাদের ২ এম.এফ কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা এই অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন রেখেছি। তুরা থেকে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের হেডকোর্য়াটার ছিল মেঘালয়ের কামাক্ষা মন্দিরে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানীগুলোর একমাত্র পথ ছিল আমাদের ডিফেন্সের উপর দিয়ে। এই পথ দিয়ে গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় পাকহানাদার বাহিনীর উপর চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাতো। পাকহানাদার বাহিনী অনুভব করতে পারলো একমাত্র চোরাগোপ্তা আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গেলে গেরিলা কোম্পানীগুলির ভিতরে আসার পথগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। আর তাদের একটাই মাত্র পথ আমাদের ডিফেন্স গুড়িয়ে দিতে হবে। ১৪ আগষ্ট ১৯৭১ সালে আনুমানিক বিকাল ৫:৩০ মিনিটে পাকহানাদার বাহিনী দুটি গান বোট নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে চরনেওয়াজী স্কুলের দিকে এগিয়ে আসে। তারাবোর ডিফেন্স থেকে চরনেওয়াজী স্কুল আমাদের হেভীমিডিয়াম মেশিনগান আর রকেট ম্যানচেষ্টার এর রেঞ্জের মধ্যে। ধীর গতিতে গানবোট দুটি নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে চরনেওয়াজী স্কুলের দিকে এগিয়ে আসে। ফায়ারিং রেঞ্জের মধ্যে আসা মাত্রই রকেট ল্যানচার ও মেশিনগান থেকে সেল এবং গুলি বর্ষণ করা হয়। রকেট ল্যানচার সেল নিক্ষেপে গানবোট দুটির, ১টির সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গানবোট দুটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। এদিকে চরনেওয়াজী স্কুলের অবস্থানরত হানাদার বাহিনী গোধুলী লগ্নে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবাহিত নালা দিয়ে আমাদের অবস্থানের উপর আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হতে থাকে এবং আমরাও তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে প্রস্তুতি নিতে থাকি। এক সময় আমাদের ফায়ারিং রেঞ্জের মধ্যে ওরা এসে পড়ায় আমরা গুলিবর্ষণ শুরু করি। গুলিবর্ষণে হানাদার বাহিনীর ১৪ সৈনিক নিহত হয় এবং বাকিরা দ্রুত পালিয়ে যায়। ইতোমধ্যে পাকহানাদার বাহিনী তাদের শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে এবং তারা তুষমারা এবং কোদালকাটির চরে তাদের অবস্থান দৃঢ় করে। সোনাভরী নদীর তীরবর্তী আমাদের ডিফেন্সের উপর অপর পার থেকে তারা প্রায়ই গুলিবর্ষণ করতো। এই সময় আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা আমাদের পাশে অবস্থান নেয়। নদীর এপার এবং ওপারের দুই পক্ষের প্রতিনিয়ত গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর শাফায়েত জামিলসহ ২ এম.এফ কোম্পানী এবং তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডিফেন্স পরিদর্শন এসে পরিদর্শন করার পর আমাদের যোদ্ধাদের উৎসাহিত করেন এবং সোনাভরী নদী পেরিয়ে কোদালকাটিতে শক্তঘাটি করার জন্য নির্দেশ দেন। আগষ্টের মাঝামাঝি তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট অবস্থান পরিবর্তন করে। সেই স্থলে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানীকে অবস্থান নিতে বলেন। নির্দেশ অনুসারে কোদালকাটি চরের দক্ষিণ অংশে আমাদের ২ এম.এফ কোম্পানীর অবস্থান এবং কোদালকাটির চরের উত্তর অংশে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানীর অবস্থান। উল্লেখ্য যে, আমি প্লাটুন কমান্ডার হিসাবে আমার প্লাটুনকে চরের সর্বশেষ দক্ষিণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেই। আগষ্টের শেষ সপ্তাহের শুক্রবার ফজরের নামাজের আজানের পরই হানাদার বাহিনী আর্টিলারী সেলিং শুরু করলে আমাদের কোম্পানীসহ প্রথম বেঙ্গলের যোদ্ধারা সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করি। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই হানাদার বাহিনী আক্রমণের জন্য সারিবদ্ধভাবে আমার প্লাটুনের দিকে এগিয়ে আসে। হানাদার বাহিনীর হয়তো ধারণা ছিল অল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থানে আছে। তাদেরকে জীবিত ধরা সম্ভব হবে। আমার প্লাটুনের অবস্থানের শেষ সীমা থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে চোরাবালি থাকায় হানাদার বাহিনীর ১টি কোম্পানী ঐ পথ ধরে অগ্রসর হয়ে চোরাবালিতে আটকে পড়ে। আমার অবস্থানের বাম পাশে এলএমজি পোস্ট থেকে আমার এলএমজি ম্যান আটকে পড়া পাকহানাদার বাহিনীকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। ঠিক সেই মুহুর্তে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানীর হেভিমেশিনগানগুলো আমাকে কভার দেওয়ার জন্য গুলি বর্ষণ শুরু করলে পাকহানাদার বাহিনীর আর্টিলারী সেলিং আর হেভি মেশিনগানের গুলি বর্ষণ এক সময় স্তব্ধ হয়ে যায়। কোদালকাটি যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর ২টি কোম্পানী নিহত ও আহতসহ পিছু হটতে বাধ্য হয়। অপরদিকে আমার প্লাটুনের ২জন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছামাদ ও আলতাফ হোসেন শাহাদৎ বরণ করেন।

- এস.এম. ওয়াহেদুন্নবী মিন্টু, একাত্তরে প্লাটুন কমান্ডার, ২-এম.এফ কোম্পানী।

 

কেআরআর/জিএআই



Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ছবি সংবাদ

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ফটো গ্যালারী

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ফটো ফিচার

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ভিডিও গ্যালারী

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

বিভাগ ভিডিও রিপোর্ট

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

সর্বশেষ খবর

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image

Gaibandha.news Ad. image

Gaibandha.news Ad. image

Gaibandha.news Ad. image


Gaibandha.news Ad. image

গল্প-প্রবন্ধ-নিবন্ধ

মতামত-বিশ্লেষণ

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

কৃষি-বিজ্ঞান

স্বাস্থ্য-চিকিৎসা

সাজসজ্জা

রান্নাবান্না

ভ্রমণ-বিনোদন

চারু-কারুকলা

শিশুকিশোর

ইভেন্ট ফটো গ্যালারী

Gaibandha.news Ad. image

ইভেন্ট ভিডিও গ্যালারী

Gaibandha.news Ad. image

আর্কাইভ

SunMonTueWedThuFriSat
1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

Gaibandha.news Ad. image

ইভেন্ট বোর্ড

খোঁজখবর - চাকুরি বিঞ্জপ্তি

Gaibandha.news Ad. image

খোঁজখবর - টেন্ডার বিঞ্জপ্তি

Gaibandha.news Ad. image

খোঁজখবর - বেচাকেনা

জরীপ/ভোটাভুটি (হাঁ/না)

Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Gaibandha.news Ad. image
Activities

© 2020 Gaibandha.News. All rights reserved. Inspired by w3schools.com

Crafted with by arccSoftTech & Powered with CSR by arccY2K.com a Subsidiary of BangladeshICT.com